শ্রীবিদ্যায় বামাচার

 ॥ বামমার্গে শ্রীবিদ্যা ॥


কৌলসম্রাট মহামাহেশ্বর আচার্য অভিনবগুপ্ত তাঁর তন্ত্রালোক-এ বলেছেন,
নিরপেক্ষঃ প্রভুর্বামো ন শুদ্ধ্যা তত্র কারণম্ ।
দেবীতৃপ্তির্মখে রক্তমাংসৈর্নো শৌচযোজনাৎ ॥ ৬০২॥
[তথ্যসূত্র:— তন্ত্রালোক| পঞ্চদশ আহ্নিক]
অর্থ :— প্রভু (পরব্রহ্ম) স্বয়ং নিরপেক্ষ ও বামাস্বরূপ; সেখানে শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা কোনো কারণ নয়।
যজ্ঞে দেবীর তৃপ্তি হয় রক্ত ও মাংসের নিবেদন দ্বারা। শৌচ বা বাহ্য শুচিতার আচার দ্বারা কখোনো দেবীর তৃপ্তি হয়না।


ত্রিকদর্শননায়িকা তথা ওড্যাণপীঠনিবাসিনী মহাত্রিপুরসুন্দরীর সাধনপদ্ধতি মূলতঃ ঊর্ধ্বাম্নায়কেন্দ্রিক। তিনি স্বয়ং ঊর্ধ্বাম্নায়নিবাসিনী । ঊর্ধ্বাম্নায়ের সাধনপদ্ধতি হলো দিব্যভাবকেন্দ্রিক। বাহ্য আচার প্রায় নেই বললেই চলে। এজন্য কাশ্মীরী শ্রীবিদ্যায় দেবীর পট বা মূর্তি পাওয়া যায়না, কিন্তু বহুল পরিমাণ চক্রোপাসনা হতো। কিন্তু পশুভাবে স্মার্তাচারে অ-শাক্তোপায়ে দেবীর পূজা অসম্ভব। আজকের স্মার্তসাম্রাজ্যাধীন কাঞ্চীপুরে কতখানি শ্রীবিদ্যা পালন করে তা সন্দেহের বিষয়। ঊর্ধ্বাম্নায়ের একটি উল্লেখযোগ্য তন্ত্র হলো কুলার্ণব তন্ত্র যেখানে পঞ্চ-ম-কারের অন্তর্যাগমূলক বিধান দেওয়া হয়েছে। দিব্যভাবের সাধনা খুব উচ্চস্তরের সাধকদের জন্য, সাধারণ সাধক ও পূজারীর জন্য নয়। তাহলে কি ত্রিপুরসুন্দরীর পূজা দিব্যভাব ব্যতীত অসম্ভব? মোটেই নয়। পঞ্চ-ম-কারের প্রত্যক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে মন্দিরস্থ বিগ্রহ ও সাধারণ সাধনা সম্ভব। মৈথুনের ক্ষেত্রে এমনকি অনুকল্প ও সম্ভব। ত্রিপুরসুন্দরীর বহির্যাগপূজা মূলতঃ বামাচারকেন্দ্রিক। তার প্রমাণ আমরা নিম্নে আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ করছি—
শ্রীবিদ্যার দুটি প্রধান শাখা। প্রথমটি কাশ্মীরের ওড্যাণকেন্দ্রিক ও দ্বিতীয়টি দক্ষিণভারতের কাঞ্চীপুরকেন্দ্রিক। কাঞ্চীকেন্দ্রিক ত্রৈপুরক্রমের প্রধান পৌরাণিক গ্রন্থ হল ললিতোপাখ্যান। এতে বলা হয়েছে,
পুরা ভগবতী মায়া জগদুজ্জীবনোন্মুখী ।
সসর্জ সর্বদেবাংশ্চ তথৈবাসুরমানুষান্ ॥ ৫৩॥ তেষাং সংরক্ষণার্থায় পশূনপি চতুর্দশ ।
যজ্ঞাশ্চ তদ্বিধানানি কৃত্বা চৈনানুবাচ হ ॥ ৫৪॥
[তথ্যসূত্র:— ললিতোপাখ্যান | দ্বিতীয় অধ্যায়]
অর্থ : পূর্বকালে ভগবতী মহামায়া, যিনি জগৎকে পুনরুজ্জীবিত করার অভিপ্রায়ে উদ্যত ছিলেন,
তিনি সমস্ত দেবতাদের অংশস্বরূপ সৃষ্টি করলেন, তদ্রূপ অসুর ও মানবজাতিকেও সৃষ্টি করলেন।  তাদের ভোজনের জন্য তিনি চতুর্দশ প্রকার পশুকেও সৃষ্টি করলেন, এবং যজ্ঞ ও তার বিধানসমূহ প্রবর্তন করে পরে তাঁদের প্রতি এই উপদেশ প্রদান করলেন।
অর্থাৎ এখানে মানুষের জন্য চতুর্দশ প্রকার প্রাণীর মাংস ভক্ষণের বিধান দেওয়া হয়েছে।

মদ্যপ্রয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে,
লক্ষ্মীঃ সরস্বতী গৌরী চণ্ডিকা ত্রিপুরাম্বিকা ।
ভৈরবো ভৈরবী কালী মহাশাস্ত্রী চ মাতরঃ ॥ ৭২॥
অন্যাশ্চ শক্তয়স্তাসাং পূজনে মধু শস্যতে ।
ব্রাহ্মণস্তু বিনা তেন যজেদ্বেদাঙ্গপারগঃ ॥ ৭৩॥
তন্নিবেদিতমশ্নন্তস্তদনন্যাস্তদাত্মকাঃ ।
তাসাং প্রবাহা গচ্ছন্তি নির্লেপাস্তে পরাং গতিম্ ॥ ৭৪॥
[তথ্যসূত্র:— ললিতোপাখ্যান | তৃতীয় অধ্যায়]
অর্থ :— "লক্ষ্মী, সরস্বতী, পার্বতী, চণ্ডিকা, ত্রিপুরসুন্দরী, ভৈরব বা শিব, ভৈরবী, কালী, মহাশাস্তৃ (অর্থাৎ অয়্যাপ্পা) ও সপ্তমাতৃকার পূজায় মদ্যের ব্যবহার অনুমোদিত। কিন্তু একজন বেদাচারী ব্রাহ্মণের উচিত এই দেবদেবীদের পূজা মদের ব্যবহার ছাড়াই করা। অন্যেরা সুরার মাধ্যমে ইচ্ছা পূরণের জন্য দেবতার পূজা করতে পারে। তাদের উচিত মদটি দেবতাকে নিবেদন করা, আত্মাকে দেবতায় স্থিত করা এবং পরে সেই মদ্যকে প্রসাদরূপে পান করা। এতে পাপ হবে না এবং দেবীর কৃপায় মুক্তি লাভ হবে।"

উল্লেখ্য এখানে বেদাচারে মদ্যপ্রয়োগ নিষেধ করেছে। অর্থাৎ বর্ণাশ্রমের ঊর্ধ্বে উঠে কৌলাচারের মাধ্যমেই একমাত্র ত্রিপুরাকে সুরা নিবেদন করা সম্ভব।

বিশ্বসার তন্ত্রে শ্রীবিদ্যার বিস্তৃত সাধনপ্রণালী আছে। তাতে বলা হয়েছে,
এবং যঃ পূজয়েদ্ দেবীং সুন্দরীং ভবসুন্দরীম্ |
তস্য হস্তে ভবেদ্ দেবীং অণিমাদ্যা গুণাকরা ||
বিনা মদ্যৈর্বিনা মাংসৈর্বিনা যোনৌ যজেৎ শিবাম্ |
সিদ্ধির্ন জায়তে তত্র কল্পকোটিশতৈরপি ||
[তথ্যসূত্র:— বিশ্বসার তন্ত্র | অষ্টম পটল | ত্রিপুরসুন্দরী পূজা]
অর্থ : যে ব্যক্তি দেবী ত্রিপুরসুন্দরীকে পূজা করে,
তাকে দেবী অণিমা প্রভৃতি গুণ ও সিদ্ধিসমূহ প্রদান করেন। মদ্য, মাংস এবং যোনি-তত্ত্ব ব্যতীত যদি দেবী শিবাকে পূজা করা হয়, তবে সেখানে কল্পকোটি শতাব্দী অতিবাহিত হলেও সিদ্ধি লাভ হয় না।

এখানে মৈথুনতত্ত্বকেও উল্লেখ করা হয়েছে যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ওড্যাণকেন্দ্রিক সৌভাগ্যাক্রম এর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল যোগিনীহৃদয় তন্ত্র। এতে বলা হয়েছে,

অলিনা পিশিতৈর্গন্ধৈ ধূপৈরারাধ্য দেবতাঃ।
চক্রপূজাং বিধায়েত্থং কুলদীপং নিবেদয়েৎ ॥১৭৭॥
[তথ্যসূত্র:— বামকেশ্বরীমত | যোগিনীহৃদয় | তৃতীয় পটল]
অর্থ :— মদ্য (অলি), মাংস (পিশিত), সুগন্ধি দ্রব্য ও ধূপের দ্বারা পরদেবতা শ্রীবিদ্যার আরাধনা করা উচিত। চক্রপূজা বিধিপূর্বক সম্পন্ন করে শেষে কুলদীপ নিবেদন করতে হয়।

শাক্তাচার্য শ্রীপাদ অমৃতানন্দনাথ তদুক্ত শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা করেছেন,
চক্রপূজামুপসংহরন্ কুলদীপনিবেদনমাহ-অলিনেতি। অলিনা হেতুনা। পিশিতৈ-মাংসৈঃ। গন্ধধূপশব্দাঃ স্পষ্টার্থাঃ। দেবতাঃ ত্রৈলোক্যমোহনাদি বৈন্দবাস্তনবচক্রগতাঃ। অলিপিশিতগন্ধধূপদীপৈরারাধ্য পূর্বোক্তরীত্যা চক্রপূজাং বিধায় কুলদীপং কুলং ষটত্রিংশৎতত্ত্বসমুদায়রূপং শরীরং তত্র ভবং দীপং।

যোগিনীহৃদয় তন্ত্রে আরো বলা হয়েছে,
মদ্যং মাংসং তথা মৎস্যং দেব্যৈ তু বিনিবেদয়েৎ।
কৌলাচারসুসংযুক্তৈঃ বীরৈস্তু সহ পূজয়েৎ ৷৷
[তথ্যসূত্র:— যোগিনীহৃদয় | তৃতীয় পটল]
অর্থ :— মদ্য মাংস ও মৎস্য দেবীকে নিবেদন করতে হবে। কৌলাচারযুক্ত বীরদের সহিত পূজা করতে হবে।
এছাড়া তদুক্ত তন্ত্রে তারপরেই বলা হয়েছে,
শিবোবাচ
এবং জ্ঞাত্বা বরারোহে কৌলাচারপরঃ সদা |
আবয়োঃ শবলাকারং মদ্যং মাংসং নিবেদ্য চ ॥
অর্থ :— ভগবান শিব বললেন, ওগো বরারোহা পার্বতী, পূর্বে কথিত প্রকারে অবগত হয়ে কৌলাচার পরায়ণ সাধক সর্বদা আমাদের (অর্থাৎ শিব এবং পার্বতী/ত্রিপুরসুন্দরী) শবলাকার মদ্য ও মাংস নিবেদন করবে ।

কৌলাগম নিত্যষোড়শীকার্ণবের একটি বিশিষ্ট অংশ হলো আনন্দ তন্ত্র। এতে ভগবান কামেশ্বর দেবী ত্রিপুরসুন্দরীর ধ্যান বা মূর্তিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,
লেহ্যৈচোষ্যৈশ্চ ভক্ষ্যৈশ্চ ধাতুপোষকরৈঃ পরৈঃ ।
মদ্যৈর্মাংসৈশ্চ মত্স্যৈশ্চ নানাবস্তূপবৃংহিতৈঃ ॥৬৬॥
[তথ্যসূত্র:— বামকেশ্বরীমত | নিত্যষোড়শীকার্ণব| আনন্দ তন্ত্র | পঞ্চম পটল]
অর্থ:— লেহ্য, চোষ্য ও ভক্ষ্য এবং ধাতুপোষক শ্রেষ্ঠ উপাদানসমূহ দ্বারা; মদ্য, মাংস ও মৎস্যাদি নানাবিধ দ্রব্যে সমৃদ্ধ উপাচারে দেবী ত্রিপুরসুন্দরী মণিদ্বীপে পরিবৃতা হয়েছেন।

এছাড়া কৌলাচার বিষয়ে আরো বলা হয়েছে,
দৃঢ় ভাবনয়া তেষাং মহাযাগো মহাফলম্ ।
যৈরেবপতনং লোকে বীরস্তৈরেব সিদ্ধ্যতি ॥১২৬ ॥
শাস্ত্রমার্গানুসারেণ দৃঢ় মানসভাবনয়াঃ ।
মধুপানৈর্মাংসভক্ষৈস্বেষ্টাহারৈশ্চ মৈথুনৈঃ ॥১২৭॥
পতনং ঘ্রিয়তে মূর্খৈরমূর্খৈরত্নদর্শনম্ |
পানাদিবস্তু জাতানাং রূপং ন নিয়তং ক্বচিৎ ॥১২৮॥
[তথ্যসূত্র:— আনন্দ তন্ত্র | ষোড়শ পটল]
অর্থ:— দৃঢ় ভাবনা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত মহাযজ্ঞই মহাফল প্রদান করে।
যেসব বস্তু বা ক্রিয়াকে এই সংসারে পতন বলে মনে করা হয়, সেইগুলির দ্বারাই বীরসাধক সিদ্ধিলাভ করে। শাস্ত্রসম্মত মার্গ অনুসারে দৃঢ় মানসিক ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে—
মধুপান, মাংসভক্ষণ, প্রিয় আহার এবং মৈথুনের দ্বারা (সাধনা সম্পন্ন হয়)। মূর্খেরা একে পতন বলে গণ্য করে; কিন্তু জ্ঞানীরা এতে তত্ত্বদর্শন লাভ করে।
পানাদি বস্তুসমূহের (ভোগ্য দ্রব্যের) রূপ সর্বত্র একরূপ বা নির্দিষ্ট নয়।

ঊর্ধ্বাম্নায়দেব্যার্চনবিধিতে ওড্যাণপীঠের অধিশ্বরী সৌভাগ্যাদেবী (মহাত্রিপুরসুন্দরী)কে বলা হয়েছে "ঘোরদষ্ট্রে করালাস্য মদ্যমাংস সদা প্রিয়ে"।
অর্থাৎ ওড্যাণপীঠনিলয়া ভগবতী ত্রিপুরা সদা মদ্যমাংস দ্বারা অর্চিতা হন।
রুদ্রযামলের ত্রিকূটা রহস্যে দেবীর বামাচারকেন্দ্রিক ও কৌলাচারপদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে, (রুদ্রযামলে ত্রিপুরসুন্দরীর ত্রিকূটা নামটি বারংবার ব্যবহৃত হয়েছে, ত্রিকূটা দেবী ও ত্রিক সম্প্রদায়ের যোগ অত্যন্ত নিবিড় বোঝাই যাচ্ছে)— 
শিবোবাচ
বামাচারং প্রবক্ষ্যামি শ্রীবিদ্যাসাধনপ্রিয়ে । 
যং বিধায় কলৌ শীঘ্র মান্ত্রিকং সিদ্ধিভাগ্ ভবেৎ ॥৬॥ 
[ তথ্যসূত্র:— রুদ্রযামল মহাতন্ত্র | ত্রিকূটা রহস্য | চতুর্থ পটল] 
অর্থ :— ভগবান শিব বললেন, হে শ্রীবিদ্যাসাধনপ্রিয়া পার্বতী (অর্থাৎ উনিই ত্রিপুরসুন্দরী) ! এক্ষণে আমি বামাচারে শ্রীবিদ্যার উপাসনা পদ্ধতি বলছি, যার দ্বারা কলিযুগে শীঘ্রই মন্ত্রাধিকারীগণ সিদ্ধি লাভ করেন। 
এরপরেই বলা হয়েছে,
মালাং নৃর্দতসম্ভূতাং পাত্রং মানুষমুণ্ডকম্ । আসনং সিংহচর্মাদি কঙ্কণং স্ত্রিকচোদ্ভবম্ ॥৭॥ দ্রব্যং মহ্যং চ মৎস্যাদ্যং ভক্ষ্যমাংসাদিকং শিবে । চর্বণং বালমৎস্যাপি মুদ্রা বীণারবঃ কথা ॥৮॥ 
মৈথুনং পরকান্তাভিঃ সর্ববর্ণসমানতা । 
অর্থ :— সাধকগণ নৃদন্তমালা, কপালপাত্র, সিংহ চর্মাসন, স্ত্রীকেশকঙ্কণ, প্রত্যক্ষ পঞ্চমকার সহযোগে শ্রীবিদ্যার উপাসনা করবেন। এই আচারে সাধকগণ সর্বদা সর্ববর্ণকে সমান দৃষ্টিতে দেখবেন। 
শিবোবাচ 
তস্মাত্নিত্যং ভজেদ্বামঃ বামেব পরাগতিঃ। 
ত্রিকূটায়াঃ পরং তত্ত্বং বামাচারো ময়া স্মৃত ॥১২॥ 
অর্থ :— মহাদেব বললেন, "এইকারণে নিত্য বামাচারে শ্রীবিদ্যার উপাসনা করা উচিত, বামাচারই হল পরমগতি। আমি বামাচার কেই ত্রিকূটাত্মিকা শ্রীবিদ্যার পরম তত্ত্ব বলে মনে করি।" 

প্রসঙ্গত, ললিতা সহস্রনামে দেবীর নামই বলা হয়েছে 'মাংসনিষ্ঠা' (যিনি মাংস ভক্ষণপ্রিয়া) —
রক্তবর্ণা মাংসনিষ্ঠা গুডান্ন-প্রীত-মানসা ।(১০৩ক)
এছাড়াও বলা হয়েছে,
মেদোনিষ্ঠা মধুপ্রীতা বন্ধিন্যাদি-সমন্বিতা । (১০৫ক)
ভাষ্করাচার্য তাঁর সৌভাগ্যভাষ্কর টীকায় ব্যাখ্যাটি এরকম করেছেন,
মধুনা মদ্যেন ক্ষৌদ্রেণ বা প্রীতা । তথা চ শ্রুতিঃ- যন্মধুনা জুহোতি মহতীমেব তদ্দেবতাং প্রীণাতী'তি । মহাদেবীং প্রীণয়তীত্যর্থঃ ।
অর্থ:—
{মধু, মদ্য বা ক্ষৌদ্র (মধু/মধুরস) দ্বারা দেবী সন্তুষ্ট হন।
এই প্রসঙ্গে শ্রুতি বলে—
“যে ব্যক্তি মধু দ্বারা হোম করে, সে মহাদেবতাকেই সন্তুষ্ট করে।”
এর অর্থ হলো—মধু দ্বারা আহুতি প্রদান করলে মহাদেবীই প্রসন্ন হন।}

মাধ্বীপানালসা মত্তা মাতৃকা-বর্ণ-রূপিণী ॥ (১১৬খ)
মাধ্বীরস বলতে দ্রাক্ষাজাত সুরা। অর্থাৎ দেবী মুহুর্মুহু তা পান করেন। এই বিষয়ে ভাষ্করাচার্য বলেছেন,
মাধ্ব্যা দ্রাক্ষাজন্যমদিরায়াঃ পানেনালসা । অন্তরেকনিষ্ঠতয়া শীতলা । অত এব মত্তেব মত্তা ।
অর্থ :— ‘মাধ্বী’ বলতে দ্রাক্ষা (আঙুর) থেকে উৎপন্ন মদিরা বোঝায়। তার পান করলে আলস্য আসে; অন্তর্মুখী একাগ্রতার ফলে এক প্রকার শীতলতা অনুভূত হয়। এই কারণেই পানকারী মত্ত হয়ে ওঠে।
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভগবতী ললিতাসুন্দরী রাজরাজেশ্বরীর পূজা ও সাধনা প্রধানতঃ দিব্যভাবের হলেও বাহ্যিকদিক থেকে দিব্যভাবের সাধকদেরও বামাচার করতে হয়। শ্রীবিদ্যাসাধক অগস্ত্য, দুর্বাসা প্রমুখরা তাঁদের বামমার্গিক সাধনার জন্য সুবিখ্যাত। এমনকি পূর্বে প্রজাপতি ব্রহ্মা কর্তৃক পূজিত কাঞ্চীপুরের বিখ্যাত শ্রীচক্রকে "ইরাত্তাম অভিষেকম্" বা রক্তাভিষেক করা হতো। কিন্তু পরে জড়ব্রহ্মবাদীদের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে কাঞ্চীপুর থেকে কৌলধর্ম বিলুপ্ত হয় ও শক্তিপীঠ তার নিজস্বতা হারিয়ে শংকরবাদীদের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিংশ শতকে লিথোগ্রাফ আসার পূর্বে দক্ষিণ ভারতে ললিতাসুন্দরীর চিত্র খুব একটা পাওয়া যায় না। আধুনিক লিথোগ্রাফে যে দেবীকে "সৌম্যকরণ" / Benignization করা হয়েছে, তাঁর প্রাচীনতম চিত্র পাওয়া যায় নেপালে। নেপালে প্রাপ্ত বহুসংখ্যক Miniature painting এবং পাউভা চিত্রে ত্রিপুরসুন্দরী মুণ্ডমালা পরিধান করেছেন। কখোনো তিনি বিপরীতরতাসক্তা রূপেও চিত্রিতা। স্মার্ত প্রভাবিত নবীন চিত্রকারদের হাতে তাঁর জ্ঞানরূপ মুণ্ডমালার অপসারণ ঘটেছে। উল্লেখ্য, রুদ্রযামলের কামেশ্বর পঞ্চাঙ্গতে কামেশ্বরের ধ্যানে বলা হয়েছে,
কপালমালাভরণো গজচর্মোত্তরীয়কঃ ।
তস্যোৎসঙ্গে স্থিতাং দেবীং মহাত্রিপুরসুন্দরীম্ ॥

বামমার্গপ্রিয়া ভগবতী ওড্যাণেশ্বরীর জয় হোক

Comments

Popular posts from this blog

Kalikula : A Brief Overview

Durga Krama : A Short Description

Who is the main deity of Durga Kula? Is it Ashtabhuja Durgambika or Chaturbhuja Jagadhatri?