চরিত্রপুর পীঠ
চরিত্রপুর পীঠ ও পরমশাক্ত অগস্ত্যঋষি
সূচনা :—
শক্তি উপাসকদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হলেন শাক্তকুলশিরোমণি অগস্ত্য। মিত্র ও বরুণের পুত্র হওয়ায় তিনি 'মৈত্রাবরুণ', কুম্ভ থেকে জন্ম নেওয়ায় 'কুম্ভযোনি' নামে তিনি প্রসিদ্ধ। বামমার্গের একজন প্রধান দিগদর্শক হলেন অগস্ত্য। 
চিত্রাপীঠে অগস্ত্যলীলা
তাঁর মাহাত্ম্য এতটাই যে, স্বয়ং ভগবান শিব আনন্দেশ্বর তন্ত্রে অগস্ত্য পূজা বিধি বর্ণনা করেছেন। ইষ্টপূজা করলে যা ফললাভ হয়, ইষ্টের পরমপ্রিয় সাধকদের পূজা করলে ততোধিক ফললাভ হয়ে থাকে। তাই ভগবতীর প্রিয় ভক্ত অগস্ত্যের পূজা করা প্রত্যেক শাক্তের কর্তব্যও বটে। সৌভাগ্যাক্রম (শ্রীবিদ্যা) সহ বহু ক্রমের গুরুমণ্ডলীর শীর্ষস্থানে ইনি এবং তস্যভার্যা শাক্তাচার্যা লোপামুদ্রা অবস্থান করছেন। তবে অগস্ত্য প্রধানতঃ মাতঙ্গীক্রমের উপাসক। একথা 'শংকর বিজয়' গ্রন্থও উল্লেখ করেছে। বলা হয়েছে, বামমার্গপ্রিয়া বিমর্ষরূপিণী রাজশ্যামলার শক্তিতেই অগস্ত্যমুনি সমুদ্রের জল শোষণ করেছিলেন। এই ঘটনার আভাস স্কন্দপুরাণেও আমরা পাই। স্কন্দপুরাণের নগরখণ্ডের তীর্থমাহাত্ম্যে বলা হয়েছে, মহর্ষি অগস্ত্য 'চিত্রা' বা 'চিত্রেশ্বর' পীঠে সাধনা করে সাগরশোষণ করেছিলেন। উক্ত অধ্যায়ে দেবীকে বিশোষণী বা সংশোষণী দেবী বলা হয়েছে। যোগিনীহৃদয়োক্ত ৫১শক্তিপীঠের তালিকা অনুযায়ী, এটি ৩৪তম পীঠ।— "উজ্জয়িনীং চিত্রাং চ ক্ষীরকং হস্তিনাপুরম্"
শাস্ত্রে উল্লেখ:—
মন্থানভৈরবাগমের ৬৪ পীঠস্থানের প্রথমটি অট্টহাস (বাংলায় অবস্থিত) এবং দ্বিতীয়টি এই চিত্রা বা চরিত্র পীঠ। স্কন্দপুরাণের নাগর খণ্ড এটিকে বর্ণনা করেছে, অর্থাৎ এটি বর্তমানে গুজরাটে অবস্থিত।
নিশিসঞ্চার তন্ত্রের চতুর্থ পটলে বলা হয়েছে,
চরিত্রে তু করঞ্জস্থা তু করালাশক্তিসম্ভবা ।
করঞ্জবাসিনীতি খ্যাতা মুদ্রাশক্তিধারিণী ॥৪১॥
তস্মিন্ ক্ষেত্রে মহাঘণ্টঃ ক্ষেত্রপালো মহাবলঃ ।
ঊর্ধ্বকেশফণান্বিতঃ সর্বদুষ্টভয়ংকরঃ ॥৪২॥
অর্থ :— চিত্রা বা চরিত্রপীঠে দেবী করঞ্জবৃক্ষে নিবাস করেন, তিনি করালশক্তি হতে আবির্ভূতা। মুদ্রা, শক্তি প্রভৃতি অস্ত্র ধারণ করেন করঞ্জবাসিনী দেবী। এই পীঠের ক্ষেত্রপাল হলেন মহাঘণ্টভৈরব। তিনি ঊর্ধ্বকেশ এবং দুষ্টদের নাশ করেন।
খঞ্জনীমত ও কুব্জিকামত তন্ত্রে দেবীর নাম 'কৃষ্ণাদেবী' বলা হয়েছে।
মূর্তিতত্ত্ব:—
শ্রীমতোত্তর তন্ত্রের উনবিংশতম পটলে দেবীর নাম 'সুসিদ্ধিদা' বলা হয়েছে, উক্ত তন্ত্রে সুসিদ্ধিদা দেবীর মূর্তিতত্ত্বটি এইরূপ,—
![]() |
| সুসিদ্ধিদা দেবী |
তিনি এক প্রেতোপরি সমাসীনা।
ইনি সুমুখীদেবীর একটি বিশিষ্ট স্বরূপ তথা অগস্ত্যমুনির ইষ্টদেবী।
চরিত্রপুর পীঠে অগস্ত্যমুনির লীলা :—
স্কন্দপুরাণের নগরখণ্ডের ৩৫তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, একদা অসুরগণ দেবতাদের দ্বারা পরাজিত হলে, তারা চিন্তা করে যে পৃথ্বীস্থিত মনুষ্যদের ধর্মীয় কার্যই দেবতাদের মূল শক্তির কারণ। তাই তারা ভূলোকে চলে আসে । দিনের বেলায় তারা সমুদ্রগর্ভে আশ্রয় নেয় এবং রাত্রিকালে বাহির হয়ে নরনিধন কার্য চালাতে থাকে। দৈত্যরা লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভক্ষণ করতে থাকে। তখন ঋষি ও দেবতারা অগস্ত্যমুনির স্মরণাপন্ন হন। অগস্ত্য সমস্তকিছু শুনে বললেন, "আমি যোগিনীশক্তি অবলম্বনপূর্বক বৎসরান্তে সমুদ্রশোষণ করব। তখন আপনারা দেবতারা ঐসব দৈত্যদের বিনাশ করবেন।"
এরপর তিনি চরিত্রপীঠে পীঠশক্তির আবাহনপূর্বক পূজা করতে লাগলেন। দীর্ঘসময় পরে তাঁর সম্মুখে চিত্রেশ্বরী সুসিদ্ধিদা কোটিযোগিনী, দিকপাল, কন্যকা, ক্ষেত্রপাল পরিবৃতা হয়ে আবির্ভূতা হলেন। তারপর দেবী বিশোষিণী সুসিদ্ধিদার উদ্দেশ্যে অগস্ত্যমুনি বললেন,
যদি দেবি প্রসন্না মে তদাস্যং বিশ সত্বরম্।
যেন সংশোষয়াম্যাশু সমুদ্রং দেবি বাগ্যতঃ॥২৫॥
সা তথেতি প্রতিজ্ঞায় প্রবিষ্টা সত্বরং মুখে।
সংশোষণী মহাবিদ্যা তস্যর্ষের্ভাবিতাত্মনঃ ॥২৬॥
[[স্কন্দপুরাণ : নাগর খণ্ড : অধ্যায় ৩৫]]
অগস্ত্য বললেন, "হে দেবি ! আপনি যদি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে শীঘ্রই আমার মুখে প্রবেশ করুন। যেন আমি তাহাতে সমুদ্র শোষণ করিতে পারি।" মুনি এই কথা বলিলে মহাবিদ্যা সংশোষণী তাঁহার মুখে প্রবেশ করিলেন।
এরপর তিনি সমুদ্রতটে এসে সকল দেবতা ও ঋষিদের আমন্ত্রণ করলেন। দেবতাদের উদ্দেশ্যে বললেন তিনি সাগরশোষণ করা মাত্র যেন অমরবৃন্দ অসুরনিধন শুরু করেন। মুনি দেবগণকে ঐ কথা বলে মৎস্য-কচ্ছপ-সঙ্কুল সমগ্র সাগর অবলীলাক্রমে পান করে ফেললেন। সমুদ্র স্থলের ন্যায় হয়ে গেল। ঐ সময় জিগীষু দেবগণ চতুৰ্দ্দিক হইতে নিশিত শরনিকর বর্ষণ করিয়া দৈত্যদিগকে বধ করে ফেললেন।
এরপর দেবতাদের নিকট প্রার্থনা করে ঐ পীঠকে তিনি মহাতীর্থের মর্যাদা আনয়ন করেন। অষ্টমী ও চতুর্দশী তিথিতে যে চিত্রা পীঠের পূজা করেন, তিনি সর্বপাপ মুক্ত হন।

Comments
Post a Comment