শৃঙ্খলা শক্তিপীঠ

 ॥ শৃঙ্খলা শক্তিপীঠ ॥ 

ভগবতী শৃঙ্খলা (জয়বাগেশ্বরী কালী)


রাঢ়বঙ্গের প্রধান শক্তিপীঠ হল প্রদ্যুম্নপুরস্থিত শৃঙ্খলাদেবীর পীঠস্থান। অধুনা হুগলী জেলার অন্তর্গত পাণ্ডুয়া শহরে অবস্থিত এই পীঠ। ইন্দ্রাক্ষী তন্ত্রোক্ত "অষ্টাদশ শক্তিপীঠ স্তোত্র" তে বলা হয়েছে, "প্রদ্যুম্নে শৃঙ্খলাদেবী"। শৃঙ্খলাদেবীর নামানুসারে এই স্থান শৃঙ্খলক্ষেত্র নামেও পরিচিত। ইনি রাঢ়দেশের অধিশ্বরী। 

পদ্মপুরাণেও এই তীর্থের উল্লেখ পাওয়া যায়, 

কস্মিন্ স্থানে ময়া যজ্ঞঃ কার্যঃ কুত্র ধরাতলে ।

কাশীপ্রয়াগস্তুঙ্গা চ নৈমিষং শৃঙ্খলং তথা ॥ 

কাঞ্চী ভদ্রা দেবিকা চ কুরুক্ষেত্রং সরস্বতী ।

প্রভাসাদীনি তীর্থানি পৃথিব্যামিহ মধ্যতঃ ॥

~ পদ্ম মহাপুরাণ, সৃষ্টি খণ্ড, অধ্যায় ১৫, শ্লোক ১৬-১৭

ব্রহ্মদেব কোন তীর্থে যজ্ঞ করবেন, সেই বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি কাশী, প্রয়াগ, তুঙ্গভদ্রা, নৈমিষারণ্য,ভদ্রতীর্থ(নর্ম্মদা কাবেরী সঙ্গম), দেবিকাতীর্থ ,কুরুক্ষেত্র, সরস্বতী, কাঞ্চী,প্রভাস এর উল্লেখ করার পাশাপাশি শৃঙ্খলতীর্থেরও উল্লেখ করেছেন। 

পাণ্ডুয়ায় দেবীর মন্দিরের ভগ্নাবশেষ


এমনকি স্মার্তাচার্য রঘুনন্দনও তাঁর গ্রন্থে মহাভারতকে উদ্ধৃত করে প্রদ্যুম্ন নগরের উল্লেখ করেছেন যা আজকের আধুনিক পাণ্ডুয়া শহর, 

প্রদুম্ননগরাক্ষম্যে সরস্বত্যাস্তথোত্তরে।

তদ্দক্ষিণ প্রয়াগস্তু গঙ্গাতো যমুনাগতা॥

স্নাত্বাতত্রাক্ষয়ং পুণ্যং প্রয়াগ ইব লক্ষতে।। মহাভারত।

দক্ষিণ প্রয়াগ উন্মুক্ত বেণী সপ্তগ্রামাখ্য দক্ষিণ দেশে।

~ রঘুনন্দনের প্রায়শ্চিত্ততত্ত্ব


অষ্টাদশপীঠস্তোত্র-এর পাঠান্তরে আমরা "শৃঙ্খলে ভৈরবীদেবী" নামটিও পাই। 

তবে এই রাঢ়পীঠাধিষ্ঠাত্রী শৃঙ্খলা কে? 

আজকের শৃঙ্খলাদেবীর মন্দির আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকে ম্লেচ্ছ কর্তৃক বিনষ্ট হওয়ায়, এখানকার সাহিত্যিক উপাদান পাওয়া যায় না। মন্দিরটিকে মিনার-এ পরিণত করা হয়। যদিও এর শিখর ও গঠনশৈলী দেখলে যে কেউ এখনো এটিকে প্রাচীন বঙ্গের মন্দিরই বলবেন । আশে পাশে এখনো পালশৈলীর মূর্তির ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায়। শৃঙ্খলামন্দিরটি ধ্বংসের পর বাঙালি জাতি এই দেবীর সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ মধ্যযুগীয় বাংলার তন্ত্রগুলিতে এই পীঠের নাম নেই (বরং আমরা সপ্তদশ শতকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলিকে শক্তিপীঠের মর্যাদা পেতে দেখছি)। এক্ষেত্রে বহির্বঙ্গের সাহিত্যের উপর অবলম্বন করতে হয়, 

স্তম্ভের ভগ্নাবশেষ 


নেপালের মৃগস্থলী কার্যত একটি শক্তিযন্ত্র। তাহাতে বাইরে থেকে বহু পীঠের ক্রম আশ্রয়প্রাপ্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভবানীপুরের তুলজাগৌরীর ক্রম সেখানে "তালেজুভবানী" নামে পরিচিত। তেমনই, উজ্জয়িনীর হরসিদ্ধি, করবীর শ্মশানের সিদ্ধলক্ষ্মী, কামরূপের কুব্জিকা, ত্রিপুরার রাজরাজেশ্বরী সহ বঙ্গের জয়বাগেশ্বরীও কাষ্ঠমণ্ডপ (কাঠমাণ্ডু)-তে স্থান পেয়েছেন। 


স্কন্দপুরাণের নেপাল মাহাত্ম্য খণ্ডে বলা হয়েছে, 

রাঢ়াৎ কালিকাদেবী শ্লেষমান্তকবনে গতা । 

জয়বাগেশ্বরীতি নাম্না প্রসিদ্ধ ক্ষেত্রসোত্তমে ॥ 

~ স্কন্দমহাপুরাণ, নেপাল খণ্ড, অধ্যায় ১


বস্তুতঃ রাঢ়পীঠের অধিশ্বরী কালিকা নেপালে স্থান পেয়েছেন। তবে ইনি দক্ষিণাকালী নন, ইনি জয়বাগীশ্বরী। বড়বানল তন্ত্রোক্ত শ্বেতকালীর ক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে ইনি জড়িত। উত্তরাম্নায়ে পূজিতা হন দেবী। 

নেপালের জয়বাগেশী


জয়বাগেশী কালীর স্বরূপটি এমন, 

দেবী শ্বেতবর্ণা, চতুর্ভুজা, হস্তে যথাক্রমে খড়গ, খেটক, স্বর্ণঘন (হাতুড়ি) ও দর্পন ধারণ করে রয়েছেন। দেবী সিংহাসীনা, স্মিতহাস্যা। 

নেপালে গর্ভগৃহস্থ নীলভৈরবসহিত জয়বাগেশ্বরী


দেবীর ভৈরব হলেন নীলভৈরব। জয়বাগেশ্বরী মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীর দক্ষিণপার্শ্বেই নীলভৈরবের মুখমূর্তির পূজা হয়। আবার, মন্দিরের বহির্ভাগে বামপার্শ্বের দেওয়ালে মহাকালের চিত্র অঙ্কিত। এই নীলভৈরবই কি বাংলার চড়কপূজার নীলেশ্বর তথা কালার্করুদ্র? বস্তুতঃ, ম্লেচ্ছ আক্রমণ পূর্বে নীলপূজার শাস্ত্রীয় স্বরূপটি বিদ্যমান ছিল, পরে বঙ্গের সমাজ অস্থির হয়ে উঠলে, এই সকল আচার ক্রমশঃ শাস্ত্রীয় থেকে লোকস্তরে নেমে আসে ও শাস্ত্রীয় প্রমাণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। সম্ভবত, জয়বাগেশ্বরীই নীলপূজার নীলচণ্ডিকা। 


বঙ্গের গৌরবোজ্জ্বল সময়ে দেবীর মন্দির পুনরায় স্থাপনের একটি প্রচেষ্টা করা যেতেই পারে। 

॥ জয় মা শৃঙ্খলা ॥

Comments

Popular posts from this blog

Goddess Tvaritā or Trotalā

Kalikula : A Brief Overview

Durga Krama : A Short Description