চৌহার পীঠ

 ॥ শাক্তধর্ম ও তৃতীয় প্রকৃতি ॥


বালার্ককোটিরুচিরাং কোটিব্রহ্মাণ্ডভূষিতাম্ । কন্দর্পকোটিলাবণ্যাং বালাং বন্দে শিবপ্রিয়াম্ ॥

সূচনা :— 

আদ্যাশক্তি হলেন জগন্মাতা। তিনি চরাচর বিশ্বের জননী। সমাজে যাঁদের কোনো স্থান নেই, সেই তৃতীয় প্রকৃতির মানুষেরাও (তৃতীয় লিঙ্গ বলাটি ভুল, কারণ সমলৈঙ্গিক মানুষেরা প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গের হয়ে থাকেন) মহাদেবীর সৃষ্টি। তাই তো শাস্ত্রে আছে, 'বিকৃতিঃ এবং প্রকৃতি' অর্থাৎ যা অস্বাভাবিক, তাও প্রকৃতির অংশ।
শ্রীশ্রীমাতা বহুচরাভট্টারিকা বালাত্রিপুরসুন্দরী


আদিপরাশক্তির বিশিষ্ট অবতার বালাত্রিপুরসুন্দরী। তিনি ললিতা মহাত্রিপুরসুন্দরীর হৃদয় হতে আবির্ভূতা হন। হৃদয়জ সত্ত্বা সবসময় একই তত্ত্বের নির্দেশ করে, (যেমন সদাশিবের হৃদয় হতে নীললোহিত রুদ্রের উৎপত্তি বস্তুতঃ তাঁদের একাত্মতাকেই প্রমাণ করে, কিংবা কুব্জিকার হৃদয়ে কালসঙ্কর্ষণীর বাস)। বালাসুন্দরী হলেন শক্তির বালিকা স্বরূপ। তিনি শিবশক্ত্যৈকরূপিণী। তাই শিব তাঁর পতিরূপে এখানে নেই, তিনি কুমারী ও স্বয়ং শিব। তবে কিছু পরম্পরায় কুমারকামেশ্বর এর উল্লেখ পাওয়া যায় । তবে তাঁরা দুজনেই শিশু হওয়ায় কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের বাস্তবিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।
কিন্নর সমাজে এই দেবীই 'বহুচরা' নামে খ্যাতা। 'বহুচরা' নামটি সংস্কৃত শব্দ 'বর্হিচরা' থেকে এসেছে। অন্বয়টি নিম্নরূপ—
"চরন্তীতি চরাঃ বর্হিণঃ চরাঃ যস্যাঃ সা বর্হিচরা প্রকীর্তিতাঃ"
অর্থ :— যিনি বর্হিণ অর্থাৎ খেচরপৃষ্ঠে আরোহনপূর্বক চরাচর ভ্রমণ করেন, তিনিই বর্হিচরা নামে খ্যাতা।
প্রসঙ্গত, বর্হি বা বর্হিণ শব্দের অর্থ পক্ষি।
এই কারণে, বিভিন্ন ধ্যানে দেবীকে হংস, কুক্কুট প্রভৃতি পক্ষিপৃষ্ঠে দেখানো হয়।
মহাবিদ্যা-সাধনার এক মহিমান্বিত প্রকাশরূপে, বহুচরা মাতার আরাধনা শ্রীমাতার পরম তত্ত্বকে—নির্গুণ-স্বরূপ ও সগুণ-স্বরূপ উভয়কে—একত্র ধারণ করে; যা পরাদ্বৈত (কৌল) দর্শনের সারমর্মকে প্রতিফলিত করে। গুজরাট ও রাজস্থানে বহুচরা মাতার প্রতি ব্যাপক শ্রদ্ধা লক্ষ্য করা যায়। দেবীকে কুক্কুট বা মুরগীর উপরে আরূঢ় অবস্থায় দেখানো হয়, তা তাঁর ত্রিগুণ ও জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সংসার)-এর উপর পরম অধিকারকে প্রতীকীভাবে ব্যক্ত করে।

চৌহারপীঠের উল্লেখ:— 

বালাত্রিপুরসুন্দরীর বা বর্হিচরা দেবীর পীঠস্থান হল "চৌহারপীঠ"। রুদ্রযামলের বালা পূজা পদ্ধতির পীঠন্যাস, বালা খড়গমালা এই পীঠের নাম আছে। দেবীকে আবার "চৌহারপীঠনিলয়া" বলা হয়েছে। কিন্নরদের কাছে এটি পরম পবিত্র তীর্থস্থান। চৌহারপীঠের অবস্থান সম্পর্কে কুলদীপিকা তন্ত্রে বলা হয়েছে,
চৌহারং পশ্চিমে লেখ্যং উত্তরে ওড্ড্যানং লিখেৎ ॥
[[তথ্যসূত্র:— কুলদীপিকা তন্ত্র: দ্বিতীয় পটল]]
সুতরাং চৌহারপীঠ ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত। বর্তমানে এটি গুজরাটের মেহসানা জেলার বেচরাজি/বহুচরাজি নগর নামে পরিচিত।
কুলচূড়ামণি ও কুলমুক্তিকল্লোলিনী (আচার্য নবমীসিংহ বিরচিত) গ্রন্থে পীঠবর্ণন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,
"কামরূপান্তু চৌহারে পূজ্যাদিক্করবাহিনী ।"
আচার্য পূর্ণানন্দ তাঁর কুলবৃত্তি গ্রন্থে অষ্টপীঠ প্রসঙ্গে বলেছেন,
চৌহারং চ ততোমন্ত্রী জালন্ধর মতঃ পরম্ ।
ওড্ড্যাণং দেবিকোট্টং পীঠাষ্টকমিদং ক্রমাত্ ॥
[[তথ্যসূত্র:— কুলবৃত্তি : সপ্তদশ পটল]]

এমনকি জ্ঞানার্ণব তন্ত্রেও এই পীঠের উল্লেখ আছে,
কুলান্তকঞ্চ চৌহারং জালন্ধরমতঃ পরম্ ।
ওড্ড্যাণং দেবিকোট্টং পীঠাষ্টকমিদং ক্রমাত্ ॥ ৬৬॥
[[তথ্যসূত্র:— জ্ঞানার্ণব তন্ত্র: চতুর্থ পটল]]

দক্ষিণামূর্তি সংহিতাতে বলা হয়েছে,
পীঠং কৌলগিরিং পীঠং কুলান্তকমতঃপরম্ ।
চৌহারঞ্চৈব দেবেশি জালন্ধরমতঃ পরম্ ॥৫০॥
[[ তথ্যসূত্র:— দক্ষিণামূর্তি সংহিতা : প্রথম অধ্যায়]]

তত্ত্বচিন্তামণি (পঞ্চম অধ্যায়), তারাভক্তিসুধার্ণব, রুদ্রযামলের ত্রিপুরভৈরবী পঞ্চাঙ্গ, দেবীরহস্য প্রভৃতি গ্রন্থে চৌহারপীঠের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়।
যোগিনীতন্ত্রে এই পীঠের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,
অশীতিযোজনং ক্ষেত্রং ষট্ত্রিংশদ্যোজনাযুতম্ ।
চৌহারাখ্যং মহাক্ষেত্রং যত্র গত্বা ন শোকতি ॥ ৫২॥

অর্থ :— অশীতিযোজন বিস্তৃত এবং ছত্রিশ যোজন গুণিত পরিমিত যে ক্ষেত্র, সেই পীঠ চৌহার নামে প্রসিদ্ধ মহাক্ষেত্র। যে ব্যক্তি সেখানে গমন করে, সে আর কখনো শোকপ্রাপ্ত হয় না।
বালাসুন্দরী দক্ষিণাম্নায়ে বিশেষভাবে পূজ্যা। এই কারণে শ্রীপরাতন্ত্রের দ্বিতীয় পটলে বলা হয়েছে,
বাললীলাসমাপন্না নিশাচরগণাবৃতা ॥২৪॥
দণ্ডপাশোদ্যতকরাঃ সর্বসাধকসিদ্ধিদা ।
শাকপুষ্করদ্বীপেষু সাধকাভেদদর্শিনী ॥২৫ ॥
চৌহারে গহ্বরে পীঠে যোনিমণ্ডলমার্গগা ।
বামাচাররতা পূজ্যা হ্যণিমাদ্যষ্টসিদ্ধিদা ॥২৬ ॥
[[তথ্যসূত্র:— পরাতন্ত্র : দক্ষিণাম্নায় বর্ণন]]

অর্থ :— দেবী বালিকারূপে প্রকাশিতা এবং নিশাচরগণ দ্বারা পরিবেষ্টিতা অবস্থায় বিচরণ করেন। তাঁর হাতে দণ্ড ও পাশ থাকে এবং তিনি সকল সাধকের জন্য সিদ্ধিদাত্রী। শাকপুষ্কর নামে পরিচিত বিভিন্ন দ্বীপ বা তীর্থক্ষেত্রে তিনি সাধকদের মধ্যে তাঁর বিভিন্ন রূপভেদ দর্শন করান।
চৌহারপীঠ গহ্বরে অবস্থিত পীঠে তিনি অধিষ্ঠিতা এবং তিনি বামমার্গীয় আচারে পূজিতা। তাঁর কৃপায় অণিমা প্রভৃতি অষ্টসিদ্ধি লাভ হয়।

বর্হিচরা দেবী :— 

বহুচরাপীঠে গর্ভগৃহস্থা বালামূর্তি


পুরাণকথায় আছে—ধূম্রলোচন দানবের বংশধর এক মহাবলি দানব ছিল দান্ধব্য। জগদম্বা বালা তাকে সংহার করে চৌহার অঞ্চলের মানুষকে তার অত্যাচারের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন।
বকারাদি-বালা সহস্রনামে দেবীর এইরূপ নামগুলি আছে,—
বর্হির্বর্হিণী বর্হা চ বর্হাক্ষী বর্হি-মণ্ডলা । বর্হি-ধারা বর্হি-বজ্রা বর্হি-ভূত-বিনাশিনী ॥

বালাত্রিপুরসুন্দরী হলেন শিশু স্বরূপ। শিশু কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই দেবীর এই স্বরূপ সকলের প্রতিনিধিত্ব করে। এপ্রসঙ্গে চৌহার অঞ্চলে প্রচলিত লৌকিক কাহিনীটি নিম্নরূপ —

বহুকাল পূর্বে গুর্জরদেশের একটি গ্রামে একটি বিবাহানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল। বিবাহিতা কিশোরীর স্বামী কোনওদিনই রাতে তার কাছে আসত না। বরং সে সাদা ঘোড়ায় চড়ে গভীর অরণ্যের দিকে ছুটে যেত। সবাই দোষ চাপাত মেয়েটির ওপর। “ওই মেয়েটাই পূর্ণ নারী নয়,” তারা হাসাহাসি করত। “হয়তো কোথাও আরেকজন উপপত্নী আছে তার,” এমন কথাও তারা বলত।
এই রহস্যের সমাধান করার সংকল্প নিল মেয়েটি। এক রাতে সে ঠিক করল—স্বামীকে অনুসরণ করবে। স্বামী রাত্রে বেরিয়ে যাওয়ার পরে সেও বেরিয়ে যায়। পরে দূরে অরণ্যে গিয়ে মেয়েটি দেখতে পায় তার স্বামী একজন কিন্নরের মত আচরণ করছে। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করল “তুমি যদি এমন হও, তবে কেন আমাকে বিয়ে করলে? কেন আমার জীবন নষ্ট করলে?” ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্বামী ব্যাখ্যা করল, “আমাকে জোর করে বিয়ে করতে হয়েছে। পরিবারের সম্মান টিকিয়ে রাখতে সন্তান জন্ম দেওয়াই ছিল আমার কর্তব্য।”
উভয়েই কাঁদতে কাঁদতে ভগবতীর কাছে প্রার্থনা জানায়। সেই সময় ভগবতী উমা বালাসুন্দরী বর্হিচরা রূপে প্রকট হয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেন এবং সেই কিন্নরের উদ্দেশ্যে বলেন,
“যারা তোমার মতো, তারা যেন নিজেদের দেহ শিখণ্ডন করে নারীবেশ ধারণ করে এবং আমাকে দেবী রূপে উপাসনা করে।”

এই লৌকিক কাহিনী হল আজকের 'হিজড়' সংস্কৃতির মূল ভিত্তি । এদের সম্প্রদায়ে বিশেষ গুরু পরম্পরাও লক্ষ্য করা যায়। এদের গুরুরা প্রত্যেক কিন্নরকে বিশেষ মন্ত্র প্রদান করে থাকেন যা বাইরের জগতে কখনও প্রকাশ হয় না। এই মন্ত্রের পিছনে শ্রীবিদ্যা তথা বালামন্ত্রের বিশেষ প্রভাব রয়েছে।

প্রত্যক্ষ বামমার্গের দেবতা (যেমন তারা, শ্যামলা) দের ক্ষেত্রে মৈথুনাচার প্রযুক্ত হবার জন্য কিন্নর বা তৃতীয় প্রকৃতির মানুষেরা এই পদ্ধতিতে অংশ নিতে পারেন না। তাই বালাত্রিপুরসুন্দরীর মাধ্যমে তারা সাধনপথে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
বর্তমানে সমগ্র তৃতীয় প্রকৃতির মানুষদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। হিন্দুবিদ্বেষী, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নানাভাবে Manipulation বা brainwash করে নিজেদের দলভুক্ত করার চেষ্টা করছে। এটি সনাতনধর্মের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

পরিশেষে, বালামুক্তাবলিস্তোত্রের একটি শ্লোক দ্রষ্টব্য, —
গিরিজাং গিরিমধ্যস্থাং গীঃ রূপাং জ্ঞানদায়িনীম্। গুহ্যতত্ত্বপরাং চাদ্যাং বালাং বন্দে পুরাতনীম্ ॥

Comments

Popular posts from this blog

Kalikula : A Brief Overview

Durga Krama : A Short Description

Who is the main deity of Durga Kula? Is it Ashtabhuja Durgambika or Chaturbhuja Jagadhatri?